পোস্টগুলি

লালন লেবেল থাকা পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

আরবী ভাষায় বলে আল্লা ফারসীতে হয় খোদাতালা

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন আরবী ভাষায় বলে আল্লা ফারসীতে হয় খোদাতালা গড বলিছে যীশুর চেলা ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভাবে। মনের ভাব প্রকাশিতে ভাষার উদয় এ জগতে মনাতীত অধরে চিনতে ভাষা-বাক্যে নাহি পাবে৷ আল্লা হরি ভজন পূজন সকলি মানুষের সৃজন অনামক অচিনায় কখন বাগীন্দ্রিয় না সম্ভবে৷ আপনাতে আপনি ফানা হলে তারে যাবে জানা সিরাজ শাহ কয়, লালন কানা স্বরূপে রূপ দেখে সংক্ষেপে।। ———— তৃপ্তি ব্ৰহ্ম, ‘লালনের মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি’, লালন মৃত্যুবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ (খোন্দকার রিয়াজুল হক সম্পাদিত), ঢাকা, ১৯৯২, পৃ. ১৫৫

আপন মনের গুণে সকলি হয়

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন আপন মনের গুণে সকলি হয়। (ও সে) পিড়েয় বসে পেড়োর খবর পায়। মুসলমানের মক্কাতে মন হিন্দুতে করে কাশী ভ্রমণ (ও রে) মনের মধ্যে অমূল্য ধন কে দূরে যায়। জাতে সে জোলা কবীর উড়িষ্যায় তাহার জাহির বার জাত তের দুয়ারী। তার তোড়ানি খায়৷ রামদাস সেই মুচির ছেলে গঙ্গা মাকে হরে নিলে ……… চাম-কাটুয়ায়। কত জনা ঘর ছেড়ে জঙ্গলে বাঁধে কুঁড়ে লালন কয়, রিপু ছেড়ে যাবি কোথায়।। ———— বাংলার বাউল ও বাউল গান, পৃ. ৮১-৮২ (সঞ্চারীর ৩য় চরণটি না থাকায় ‘ডট’ চিহ্ন দেওয়া হয়েছে।) (১) আপন মনের গুণে সকলই হয়। পিড়ে নেয় পেড়োর খবর, কেউ দূরে যায়। জাতিতে জোলা ফকির উড়িষ্যায় তাহার জাহির বার দেশ জুড়ে তাহার তুড়ানি যায়। রামদাস রাম বলে জাতিতে মুচির ছেলে গঙ্গা তাকে নিল কোলে চামড়ার ঠোটায়া। আপন মনোগুণে বনে কেউ বাঁধে কুঁড়ে লালন কয়, রিপু ছেড়ে কেলি কোথায়।।– লালন-গীতিকা, পৃ. ৩৮-৩৯ (২) আপন মনের গুণে সকলই হয়। পিড়ায় পায় পেড়োর খবর সেই দূরে যায়। নামটি রামদাস বলে জাতি সে মুচির ছেলে গঙ্গা আনিল হরে চাম কাটুয়ায়। ভক্ত সে জোলা কবীর উড়ষ্যায় তাহার জাহির ছত্রিশ তারই ধাড়ী তুড়ানী খায়। কত জন ঘর ছেড়...

আদি কালে আদমগণ

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন আদি কালে আদমগণ এক এক জায়গায় করত ভ্রমণ। ভিন্ন আচার ভিন্ন বিচার তাইতে সৃষ্টি হয়। জানত না কেউ কারো খবর ছিল না এমন কলির জবর। এক এক দেশে ক্রমে শেষে গোত্র সৃষ্টি পায়। জ্ঞানী দ্বিগ্বিজয়ী হল নানা রূপ সব দেখতে পেল। দেখে নানা রূপ। সব হল বেকুব এরূপে জাতির পরিচয়। খগোল ভূগোল নাহি জানত যার যার কথা সেই বলিত। লালন বলে, কলিকালে জাত বাঁচানো দায়।। ———— মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী, লোকসংগীত, ঢাকা, ১৯৯৯, ৫২-৫৩; তৃপ্তি ব্ৰহ্ম, লালনের মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি, লালন জন্ম-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ১৫৭ (এখানে ৩য় স্তবকটি নেই।)

উবুদ করা নদী দেখলাম ভাই

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন উবুদ করা নদী দেখলাম ভাই। আসমানে তার তোলি। কত জাহাজ মলুক যাচ্ছে কারা শুনে নদীর কলকলি। সেই নদীতে জোয়ার এলে উঠে সোনা আ-জোয়ারে উঠে লোনা আচ্ছা মজার ফলি৷ ও সে রসিক মাঝি দিচ্ছে পাড়ি ওহিক যারা যাচ্ছে মারা সদায় খায় চুব-চুবানি৷ লালন কয়, সদায় থেকো অনুরাগে হোসনে যেন খলখলি৷। ———— হারামণি, ৫ম খণ্ড পৃ. ৯০. গানটি সম্পূর্ণ সংগৃহীত হয়নি। সঞ্চারী ও আভোগর কোন কোন চরণ missing. অন্য পাঠ না পেলে এর পুনর্গঠন সম্ভব নয়। এটি দেহতত্ত্বের গান; নদী, জাহাজ, মাঝির রূপকে গানটি রচিত হয়েছে। বিষয় ও তার উপর দখল না থাকলে এরূপ রূপক রচনা করা যায় না।

একবার জগন্নাথে দেখ রে যেয়ে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন একবার জগন্নাথে দেখ রে যেয়ে জাত কেমনে রাখো বাঁচিয়ে। চণ্ডালে আনিলে অন্ন, ব্রাহ্মণে তাই খায় চেয়ে। জোলা ছিল কবীর দাস তার তোড়ানি বার মাস উঠছে উথলিয়ে। সেই তোড়ানি খায় যে ধনী সেই আশে দরশন পেয়ে। ধন্য প্রভু জগন্নাথ চায় না রে সে জাত-অজাত ভক্তের অধীন সে। জাত বিচারী দুরাচারী যায় তারা সব দূর হয়ে। জাত না গেলে পাইনে হরি কি ছার জাতের গৌরব করি ছুঁসনে বলিয়ে। লালন বলে, জাত হাতে পেলে পুড়াতাম আগুন দিয়ে।। ———— লালন ফকির : কবি ও ব্য, পৃ. ১৭২; লালন-গীতিকা, পৃ. ৩০-০৮; বাংলার বাউল ও বাউল গান, পৃ. ৯৬ (সঞ্চারীর ১ম চরণে ‘ধন্য প্রভু’ স্থলে ‘ধর্ম-প্রভু’ কথান্তর আছে।) সরলাদেবী ‘ভারতী’র ভাদ্র, ১৩০২ সংখ্যায় ‘লালন ফকির ও গগন’ প্রবন্ধে গানটি উদ্ধৃত করেন। এখানে ধুয়ার ১ম চরণ জগন্নাথে দেখ রে যে “এবং সঞ্চারীর ৪র্থ চরণ “এবার জাত বিচারী দুরাচারী”– রূপে সংকলিত হয়েছে।

উপরোধে কাজ দেখ রে ভাই

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন উপরোধে কাজ দেখ রে ভাই, ঢেঁকি গেলার মতো। ও রে তা যায় না গেলা ওলা গলা ফেড়ে হয় সে হত৷ মনটা যাতে রাজি হয় প্রাণটা তাতে আপনি যায় পাথর দেখে শোলার মতো। আবার বেগার ঠেলা ঢেঁকি গেলা টাকশালে সই নাই তো। মুচির চাম-কেটোতে গঙ্গা মা কোন গুণে যায় দেখ না কেউ ফুল দিও পায় না তো। মন যাতে নয় পূজলে কি হয় ফুল দিয়ে শত শত ৷ যার মনে যা লাগে ভাই করুক করুক তাই তার গোল কেন আর এতো। লালন বলে, লাথিয়ে পাকালে সে ফল কি হয় মিঠো।। ———— ৬১৭. লালন ফকির : কবি ও কাব্য, পৃ. ২৫৭-৫৮; ললন-গীতিকা, পৃ. ৩০৮-০৯ ‘বাংলার বাউল– বাউল গানে’ ধুয়ার ৪র্থ চরণ “ওলা-গেল। কার হয় সে তো।” এবং ভনি. “লানি বলে লাথিযে কালে/সে ফল হয় না মিঠে, হয় তিতো”– এরূপে সংকলিত হয়েছে।– পৃ. ৭৬-৭৭। ভনিতার চরণটি “লালন বলে লাগিয়ে পাকালেসে ফল হয় তিতো”– এভাবে পুনর্গঠন করা যায়।

তুমি কার কেবা তোমার এই সংসারে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন তুমি কার কেবা তোমার এই সংসারে। মিছে মায়ায় মজে কেন এমন করো রো এত পীরিত দন্ত জিহ্বায় কায়দা পেলে সেও সাজা দেয় স্বল্পতে সব জানিতে হয়। ভাব-নগরে। সময়ে সকলি সখা অসময়ে কেউ না দেয় দেখা যার পাপে সে ভোগে একা চার যুগে রে৷ আপনি যখন নও আপনার কারে বল আমার আমার সিরাজ সাঁই কয়, লালন তোমার জ্ঞান নাহি রে।। ———— বাংলার বাউল ও বাউল গান, পৃ. ২৪

বসত বাড়ির ঝগড়া কাইজা মিটল না

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন বসত বাড়ির ঝগড়া কাইজা মিটল না। ঘরের চোরে চুরি করে বসতের সুখ কেমনে হরে। ঠিক জান সে ভূতের প্রকার তেমনি তাহার বসতখানা৷ সর্ব চোর হাকিমের ধারে আর্জি করলাম বারে বারে সাক্ষাতের ধন নিলো চোরে এ লজ্জায় প্রাণ বাঁচে না। ভেবে চিন্তে আত্মকলহ বাড়ির কর্তা হত হইল লালন বলে, মোরে সে তো একদিন এসে দেখল না৷। ———— হারামণি, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৮-৯৯ লালনের গানের ধুয়া দুই চরণের হয়ে থাকে। এখানে একটি চরণ আছে। সম্ভবত অপর চরণটি স্মৃতি চ্যুত হয়েছে। অন্তরা ও আভোগে অন্ত্যমিল রক্ষিত হয়নি। এতে গানটি স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্য হারিয়েছে।

পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়। করমের লিখিত কাজ করিলে দোষ-গুণ তার কি হয় শুনিতে পাই সাধু সংস্কার পূর্বে থাকলে পরে হয় তার পূর্বে নাই হল না এবার আর কি তার আশায়। বাদশার আজ্ঞায় দিলে ফাঁসি ফাঁসিদার তো হয় না দোষী জীবের পাপ করিয়ে কি সাঁই তার নরক দেয়। কর্মের দোষ কি কাজকে দোষাই কোন কথাতে গিরে দেয় ভাই লালন বলে, আমার বোধ নাই শুনলে কিবা হয়।৷ ———— লালন ফকির : কবি ও কাব্য, পৃ. ১৯২; লালন-গীতিকা, পু, ২৬৮ (অন্তরার ১ম চরণে “শোণিতে পাই স্বাদ সোমেস কার”. এরূপ কথান্তর আছে। কিন্তু এর অর্থ স্পষ্ট নয়। কথান্তর : পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়। কর্মের লিখন কাজ করিলে দোষ-গুণ কি তার হয়। শুনতে পাই সাধু সংস্কার পূর্বে যদি না থাকে কার ……… তার কি আশায় বাদশার আজ্ঞায় দিলে ফাঁসি ফাঁসিদার কি হয় গো দোষী জীব করে সব নরকবাসী খোদ কি দয়াময়। কর্মের দোষ কি কাজকে দোষাই কোন কথাটি গেরো দেই ভাই লালন বলে, আমার দোষ নাই বললে কি তাই হয়৷।– বাউল কবি লালন শাহ, পৃ. ২৮১-৮২

কাকে শুধাই রে সেই মুরশিদ, কে বলবে আমায়

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন কাকে শুধাই রে সেই মুরশিদ, কে বলবে আমায়। পশু-বধ করিলে খোদা কিসে খুশি হয়। ইব্রাহিম নবীরে শুনি আদেশ করেন আল্লা গণি প্রিয় বস্তু দাও কোরবানি দুম্বা, পুত্র বলির আদেশ কোথায়। মরণের আগেতে মরা আপন প্রাণ কোরবানি করা প্রাণ অপেক্ষা যে পেয়ারা তবে কি বুঝায় শরায়। মাবিয়া আপনার জান আরেফেতে দেয় বলিদান নবীজী হাদিসে ফরমান মউত আনতা কবলল মউত৷ কেমনে হবে কোরবানি সে ভেদ প্রকার লই জানি লালন বলে, কোথায় শুনি হবে সাঁইর কোরবানি সে এক্তেদায়॥ ————- হারামণি, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৮-৯। ৩য় স্তবকে “মউত আন্তা কবুল মউতা” চরণে অন্ত্যমিল রক্ষিত হয় নি। সম্ভবত কোন শব্দ লোপ পেয়েছে।

ধর্ম-বাজার মিলাইছে নিরঞ্জনে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন ধর্ম-বাজার মিলাইছে নিরঞ্জনে৷ কানা চোরে চুরি করে ঘর থুয়ে সিঁদ দেয় পাগাড়ে হস্ত নাই সে ওজন করে বোবায় গান করে, বয়রায় বসে শোনে। কানায় করে দোকানদারী বোবায় বলে মাল নিচ্ছে তাহারি সেই হাটে এক বাঁজা নারী ও ছেলে কোলে হাসছে মনে মনে। ভাঙবে বাজার উঠবে ধ্বনি মানুষ নাই তার শব্দ শুনি তালাব(১) নাই তার মধ্যে পানি অধীন লালন ভাবছে মনে মনে।। ———— হারামণি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৮৭ গানটি রূপকের ভাষায় রচিত। লালন তত্ত্বাশ্রিত রূপকের ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ১. তালাব (ফারসি)– পুকুর।

ও রে আল্লার আশকি যে হয়

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন ও রে আল্লার আশকি যে হয়, আশকের জোরে গগনের চাঁদ টেনে পাতালে নামায়। নাম জপে না, কাম করে না। সদায় দিল আশিক দেওয়ানা তাইতে কি আর সই রব্বানা কেবল মদদ দেয়। সুঁই ছিদ্রে চালায় হাতি বিনে তেলে জ্বালায় বাতি কখন হয় তার নিষ্ঠা রতি কেবল ঠাঁই-অঠাঁই সে রয়। আশিকে মাশুকে নামাজ শুদ্ধ দেলে হয় তার কাজ লালন বলে, শৃগালের কাজ দিয়া সিংহের দায়।। ———— হারামণি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১০২-০৩, ৭ম খণ্ড পৃ. ৩৯৪ (উভয় গ্রন্থের সমন্বয়ে পাঠটি নির্ণয় করা হয়েছে। ধুয়ার ২য় চরণে ‘পাতালের’ স্থলে ‘মর্ত্যে’ কথান্তর আছে।)

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি। ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম। তাকে তোমরা বল কি। ছয় মাসের এক কন্যা ছিল নয় মাসে তার গর্ভ হল এগার মাসে তিনটি সস্তান কোনটা করবে ফকিরি৷ ঘর আছে তার দুয়ার নাই মানব আছে তার কথা নাই কেবা তাহার আহার জোগায়। কে দেয় সন্ধ্যাবাতি৷ লালন সাঁই ফকিরে বলে মাকে ছুঁলে ছেলে মরে এই তিন কথার অর্থ নইলে তার হবে না ফকিরি।। ———— লালন-সঙ্গীত, পৃ. ৯৫ গানটি কলার গাছ, কবর ও লবণ সংক্রান্ত বাংলা ধাঁধা ও প্রবাদের উপর ভিত্তি করে রচিত। বাউলমতের তত্ত্ব ব্যাখ্যায় ধাঁধা ও প্রবাদের এরূপ ব্যবহারে লালনের ভাষা-জ্ঞান ও প্রকাশ-ভঙ্গির অসাধারণ দক্ষতা প্রকাশিত হয়েছে। লোকগীতি-স্বরলিপি (১ম খণ্ড) গ্রন্থে গানটির স্বরলিপি দেওয়া হয়েছে। এখানে গানের বাণীতে সামান্য পাঠভেদ আছে। আভোগের স্তবকটি নিম্নে দেওয়া হল : ফকির লালন ভেবে বলে ছেলে মরে মাকে ছুঁলে (হায় হায়) আবার এই কয় কথার অর্থ নইলে তার হবে না ফকিরি।– পৃ. ১০৬ ২য় চরণের “ছেলে মরে মাকে ছুঁলে” পাঠ অন্ত্যমিলের বিচারে শুদ্ধ। পাঠটি গ্রহণ করা যায়। অতিরিক্ত ‘হায় হায়’ সুরে খাতিরে যুক্ত হয়েছে।

কুলের বউ ছিলাম, রাঁড়ি হলাম নাড়ি নাড়ার সাথে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন কুলের বউ ছিলাম, রাঁড়ি হলাম নাড়ি নাড়ার সাথে। কুলের আচার, কুলের বিচার আর কি ভুলি সেই ভোলাতে। ভাবের নাড়ি, ভাবের নাড়া কুল নাসালাম জগৎ জোড়া করণ তার উল্টা দাঁড়া বিধির ফাঁড়া কাটবে যাতে। হয়েছি নাড়ার নাড়ি পরণে পড়েছি ধড়ি দিব না আচাই কড়ি বেড়াই চৈতন্য-পথে৷ আসতে নাড়া যেতে নাড়া এ কেবল ঘোড়া জোড়া লালন কয়, আগাগোড়া জানিয়ে মাথা হয় মুড়াতে।। ———— লালন ফকির : কবি ও কাব্য, পৃ. ১৯৫-৯৬; লালন-গীতিকা, পৃ. ২৭৪-৭৫ (ধুয়ার চরণটি “কুলের বৌ ছিলাম বাড়ি, হলাম নাড়ি নাড়া সাথে”– এভাবে লেখা হয়েছে।)

জাত গেল, জাত গেল বলে এ কি আজব কারখানা

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন জাত গেল, জাত গেল বলে এ কি আজব কারখানা। সত্য পথে কেউ নয় রাজি সব দেখি তানা-না-না। যখন তুমি ভবে এলে তখন তুমি কি জাত ছিলে কি জাত হবা যাবার কালে সেই কথা কেন বল না। ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি এক জলেতে সকল শুচি দেখে শুনে হয় না রুচি যমে তো কা’কেও থোবে না৷ গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে জাতির কি ক্ষতি হয় লালন বলে, জাত কারে কয় এ ভ্রম তো আর গেল না।। ———— তৃপ্তি ব্ৰক্ষ, ‘লালনের মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি’, লালন মৃত্যু-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ১৫৯

মেরে সাঁইর আজব লীলা তা কেউ বুঝতে পারে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন মেরে সাঁইর আজব লীলা তা কেউ বুঝতে পারে। কালায় শোনে, অন্ধ দেখে এই ভাব-নগরে। ন্যাংড়া সে নেচে বেড়ায়, অন্ধ জনায় সব দেখে রে। মরা করে তাজা আহার ধরে ধরে। জল নাই দেখি সদ্য ভাসে পদ্ম সেই পুকুরে। এ বড় রহস্য কথা বলবো কারে। খাঁচায় কৌতর নাই তার উড়ছে পাখি নিরন্তরে। সিরাজ সাঁই কয়, দেখ রে লালন দেখ নজরে।। ———— লালন-গতিকা, পৃ. ১০৫

চাঁদ-বদনে বল গো সাঁই

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন চাঁদ-বদনে বল গো সাঁই, বান্দার এক দমের ভরসা নাই৷ কে হিন্দু, কে যবনের চেলা পথের পথিক চিনে ধর এই বেলা। পিছে কাল শমন থাকে সর্বক্ষণ কোন দিন বিপদ ঘটাবে ভাই। আমার বাড়ি, আমার বিষয় ঐ রবে দিন গেল রে সদায়। বিষয়-বিষ খালি সে ধন হারালি সেদিন কাঁদলে আর কি হবে ভাই। নিকটে থাকিতে সে ধন সদায় চঞ্চলাতে দেখলি নারে মন। ফকির লালন কয়, সে ধন কোথায় রয় আখেরে খালি হাতে যেতে হবে রে ভাই।। ———— হারামণি, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪০৯-১০; বাংলার বাউল ও বাউল গান, পৃ. ৫৬-৫৭ (এখানে ধুয়া শুরু হয়েছে। এভাবে—“সদায় মুখে-দেলে রাখ গো সাঁই।”)

আমি যার ভাবে মুড়িয়েছি মাথা

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন আমি যার ভাবে মুড়িয়েছি মাথা, সে জানে আর মন জানে, আর জানবে কে তা। মনের মানুষ রাখবো মনে বলবো না তা কারো সনে ও তা ঋণ শুধিব কতদিনে মনে সদাই সেই চিন্তা। সুখের কথা বোঝ সুখী ও দুখের কথা দুখী ও পাগল বিনে পাগলের কি বোঝে মনের ব্যথা। যারে ছিদাম যারে তুই ভাই আমার হাল আর শুনে কাজ নাই অতি বিনয় করে বলে লালন কানাই পদে রবে তা।। ———– লালন-গীতিকা, পৃ. ২০৭-০৬

বার তাল উদয় হল কলিকালে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন বার তাল উদয় হল কলিকালে। কি করি কোন পথে যাই পড়ে গোলমালে৷ কাশী কি গয়াতে যাই ভেবে কিছু দিশে না পাই ও কথা কারে শুধাই মেলে কি মক্কাতে গেলে। পাপক্ষয় গঙ্গাস্নানে খ্রীস্টানেরা কয় জর্ডানে এ কথা নেয় না মনে আন্দাজে তীর্থে ঠেলে৷ যথা যাই মানুষ দেখি মানুষ দেখে জুড়াই আঁখি লালন বলে, আমি বা কি না দেখে খুঁজি জঙ্গলে।। ———— তৃপ্তি ব্ৰহ্ম, ‘লালনের মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি’, লালন মৃত্যু-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ১৫৬

এনেছে এক নবীন আইন নদীয়াতে

শিল্পী: লালন গীতিকার: লালন এনেছে এক নবীন আইন নদীয়াতে। বেদ-পুরাণ সব দিচ্ছে দুষে সেই আইনের বিচার-মতো সাতবারে খেয়ে একবার স্নান নাই পূজা, নাই পাপ-পুণ্য জ্ঞান অসাধ্য রে সাধ্য বিধান শিখাচ্ছে সব ঘাটে-পথে। না করে সে জেতের বিচার কেবল শুদ্ধ প্রেমের আচার সত্য মিথ্যা দেখে প্রচার সাঙ্গপাঙ্গ জাত অজাতে৷ ভজ শুদ্ধ ঈশ্বরের চরণা তাই বলে সে বেদ মানে না লালন কয়, তার উপাসনা কর দেখি মন কি দোষ তাতে।৷ ———— লালন-গীতিকা, পৃ. ২২১ ‘হারামণি’ ৫ম খণ্ডে সঞ্চারীর ৩য় চরণে “সত্য মিথ্যা দেখ এবার” এবং অভোগের ১ম চরণ “পেয়ে ঈশ্বরের রচনা”– এরূপ পাঠভেদ আছে।– পৃ. ১দ/.